(toc)
সওর গুহায় অবস্থান:
এদিকে রাত ফুরিয়ে গেল। পাখির কিচির আওয়াজ ও কলরবে সকলের নিদ্রা ভঙ্গ হল। অপেক্ষমান শত্রু বাহিনী নবী করীম (সঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে না পেয়ে তাঁর অনুসন্ধানে সকলেই বেরিয়ে পড়ল। এদিকে নবী করীম (সঃ)-এর পাকড়াওকারী-কে একশত উট পুরষ্কার দেয়ার লোভনীয় ঘোষনা মক্কার অলিতে-গলিতে পৌঁছে দেয়া হল। রাসূল (সঃ) সিঙ্গীকে আকবর (রাঃ)-কে নিয়ে সত্তর পর্বতের একটি আগাগোপন করে রইলেন।
মদীনায় প্রস্থান ও সুরাকা মালিকের সাক্ষাৎ:
গারে ছওরে তিনদিন অবস্থানের পর নবী করীম (সঃ) মদীনা অভিমুখে রওনা হলেন। তাঁরা দুটি উটে আরোহণ করে গন্তব্যের দিকে চললেন। হঠা দেখা গেল দূর থেকে কে যেন ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত বেগে আসছে। সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) রাসূল (স)-কে লক্ষ্য করে বললেন, রাসুলুল্লাহ্। ঐ তো আমাদের ধরার জন্য কে যেন আসছে। নবী করীম (সঃ) লেলিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কুরআন তেলাওয়াত করতে লাগলেন। দেখা গেল সুরাফ। বিন মালিক (রাঃ) (পরবর্তীতে তিনি মুসলমান হন) তাঁদের এত কাছে এসে পৌঁছেছে যে, সে রাসুল (সঃ)-এর কোরআন তেলাওয়াতও শুনতে পাচ্ছিল। নবী করীম (সঃ) তখন তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। সাথে সাথেই উত্তপ্ত মরুভূমিতে তাঁর ঘোড়া দেবে গেল। আর সে ঘোড়া হতে ছিটকে প্রায় দশ গজ দূরে কাতরাতে লাগল। নিরুপায় হয়ে সে নবী করীম (সঃ)-এর কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইল। দয়ালু নবী (সঃ) তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
কুবায় অবস্থান:
কুবা মদীনার কাছাকাছি অবস্থিত একটি জায়গা। কয়েকদিনের বিরাসহীন ভ্রমণের পর নবী করীম (সঃ) সন্ধ্যার সময় কুবায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। এদিকে রাসূল (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের খবর শুনে মদীনাবাসী প্রত্যেক কুবায় এসে তাঁর জন্য সারাদিন অপেক্ষা করে সন্ধ্যা বেলায় চলে যেতেন, আজও তাই হলঃতাদের প্রায় সকলেই প্রতীক্ষার প্রহর গুনে চলে গেছেন। শুধু রয়ে গেছেন নবী প্রেমে উম্মাদ কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, তারা কুবার সু-উচ্চ চূড়ায় আরোহণ করে এদিক-সেদিক তাকিয়ে রাসুল (সঃ)-এর আগমনের প্রতিক্ষা করছিলেন।
হঠাৎ দেখা গেল মরুভূমির অপর প্রান্তে সাদা পোষাকধারী দু'জন লোক উটে আরোহন করে আসছেন। তাদের আর বোঝার বাকি রইল না যে, ইনি তাদের বহু প্রতিক্ষীত সে মহা মানবটি।
তারা সেখান থেকে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করতে লাগল-ওহে মদীনাবাসী। তোমরা যার প্রতিক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছ, সে দয়ালু নবী আমাদের মাঝে আসছেন। তোমরা তার অভ্যর্থনা জ্ঞাপন কর। এর আওয়াজ শোনামাত্রই মদীনায় অলি-গলিগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। আবাল বৃদ্ধ বণিতা সকলেই মিছিল সহকারে কুবার দিকে ছুটে চলল। তাঁরা মহানবী (সঃ)-কে প্রাণঢালা অভিনন্দন জ্ঞাপন করল। বহু দিনের বিনিদ্র আখিগুলো সর্বশেষ নবী (সঃ) দর্শন লাভের মাধ্যমে তাদের নয়ন জুড়াল। আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে প্রবাহিত হল অজস্র আনন্দাশ্রু ধারা। নবী করীম (সঃ) গৌঁছে গেলেন নিরাপদ নিরালয়ে নিরাপদ ভূমিতে।
হিজরীসনের সূচনা:
কুবায় চৌদ্দদিন অবস্থানের পর নবী করীম (সঃ) রবীউল আউয়াল মাসের জুমাবারে মদীনায় গমন করেন এবং এরই মধ্যে কুবাতে একটি মসজিদে নির্মাণ করেন। যা ছিল ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মসজিদ। যেহেতু হিজরতের পরিকল্পনা মুহাররম মাসে নিয়েই তাই হযরত উমর (রাঃ) মুহাররম মাসকে বছরের প্রথম মাস গণনা করে ইসলাম পঞ্জিকা তথা হিজরী সনের সূচনা করেন।
মসজিদে নব্বীর ইতিহাস:
মদীনায় পৌঁছে বনী সালেম বিন আউফের বাড়ির কাছে জুমার নামাজের সময় হয়ে গেল। হুজুর (সঃ) উট থেকে নেমে জুমুআর নামাজ আদায় করেন। এরপর উটকে ছেড়ে দেয়া হল। উট যেখানে গিয়ে বসে পড়ল, সে জায়গাটিকে ক্রয় করে কাঁচা ইটের দেয়াল ও খেজুর গাছের ডাল দিয়ে ছাদ বানিয়ে নির্মাণ করা হল-মসজিদে নব্বী। আর মজিদের সাথে দুটি হুজরা তৈরি করা হল। যার একটি ছিল হযরত আয়শা সিদ্দীকাহ্ (রাঃ)-এর জন্য। আর অপরটি হযরত সাওদাহ্ (রাঃ)-এর জন্য।
হযরত উমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে মসজিদে নব্বীর নির্মাণ কাঠামো পূর্বের মত রেখে এর জায়গা আর সম্প্রসারণ করা হয়। এরপর হযরত উসমান (রা)-এর খেলাফতকালে এতে ব্যাপক পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়।
বিরাট এলাকা সম্প্রসারণ করা হয়। দেয়ালগুলো নকশী পাথর, চাঁদীর নকশা ও থামগুলো নকশাযুক্ত পাথরের। আর ছাফ শাল কাঠ দিয়ে তৈরি করা হল। এরপর হযরত উমর বিন আব্দুল আজীজ (রঃ)-এর রাজত্বকালে তারই নির্দেশে এতে আর পরিবর্তন পরিবর্ধন করা হয় এবং উম্মুল মুমীনদের বাসস্থান এতে সংযুক্ত করা হয়। এরপর ১৬০ হিজরীতে খলীফা মাহদী ও ২০২ হিজরীতে আল মানুন এতে আর পরিবর্তন পরিবর্ধন করেন এবং এর ভিত্তি খুবই মজবুত করে গড়ে তোলেন। এরপর উসমানিয়া সুলতানগণ একে আরও সুন্দর ও চিত্তাকর্ষকরূপে নির্মাণ করে এর শ্রীবৃদ্ধি করেন। এরপর থেকেই যুগে যুগে সেই ভিত্তির উপর তাকে আর সুনিপূণ ও সুচারুরূপে গঠন করা হয়েছে।
ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও জিহাদের সূচনা:
মদীনা মুনাওয়ারাহ্ ইসলামের নিরাপদ ভূমি। রাসূল (সঃ) তথায় গিয়ে সর্বপ্রথম মদীনায় বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে চুক্তি করলেন, সর্বাবস্থায় পরস্পর সাহায্য-সহযোগীতা করার। এরপর তথায় প্রতিষ্ঠা করলেন ইসলাম অনুশাসন কিন্তু মককার কাফেররা রাসূল (সঃ)-কে বিতারিত করেই ক্ষান্ত হয়নি।বরং তার মদীনা আক্রমণের জন্য বিভিন্নভাবে শক্তি সামর্থ সংগ্রহ করছিল এবং তরে তলে মদীনার ইয়াহুদীদেরকে রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছিল। এ কারণেই নবী করীম (সঃ) বিভিন্ন সময় কুরাইশদের মোকাবেলায় সৈন্য প্রেরণ করেছেন এবং কোন কোন যুদ্ধে তিনি নিজেও অংশ গ্রহণ করে অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, যে সকল যুদ্ধে হুজুর (সঃ) নিজে অংশ নিয়েছেন ইতিহাসে একে "গযওয়া" বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর যেগুলোতে তিনি কোন সাহাবীকে আমীর নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন একে "সারিয়্যাহ্” বলা হয়। গাযওয়ার সঙ্খ্যা ২৩টি এবং সারিয়্যাহর সংখ্যা মোটামুটি ভাবে ৪৩ টি।
প্রথম হিজরী:
প্রথম হিজরীতে দুটি সারিয়্যাহ্ প্রেরণ করা হয় যার একটির নেতৃত্ব দেন হযরত হামযাহ্ (রাঃ)। আর অপরটির হযরত উবাদাহ্ ইবনুল হারিস (রাঃ)।
দ্বিতীয় হিজরী:
এ বর্ষে মোট পাঁচটি গযওয়া সংঘটিত হয়-(১) গযওয়ায়ে আবওয়া যাকে উদ্দানও বলা হয়। (২) গযওয়ায়ে বুয়াত (৩) গযওয়ায়ে বদরে কুবরা (৪) গযওয়ায়ে বনী কায়নুকা (৫) গযওয়ায়ে সাবিক। এছাড়াও তিনটি সারিয়্যাহ্ প্রেরণ করা হয়। যার প্রথমটির নেতৃত্ব দেন হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন জহশ (রা)। দ্বিতীয়টির আমীর ছিলেন হযরত উমায়ের (রা) শেষটির আমীর নিযুক্ত হয়েছিলেন হযরত সালেম (রাঃ)।
দ্বিতীয় হিজরীর উল্লেখযোগ্য গযওয়া ছিল বদর যুদ্ধ। মদীনা হতে প্রায় আশি মাইল দূরে বদর নামক একটি কূপ রয়েছে। এ যুদ্ধ ঐ কূপের নিকট সংঘটিত হওয়ার কারণেই এটাকে ইতিহাসে বদর যুদ্ধ বলে অভিহিত করা হয়।
যুদ্ধের কারণ:
কুরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি প্রধান অংশ মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেয়া হত। তাই তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিহত করা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে একটি প্রধান কাজ ছিল। দ্বিতীয় হিজরীর রমজান মাসে নবী করীম (সঃ) জানতে পারলেন কুরাইশদের এক ব্যবসায়ী দল সিরিয়ার ব্যবসা শেষে মককায় প্রত্যাবর্তন করছে। তাই তাদের প্রতিহত করার জন্য দ্বিতীয় হিজরীর রমজান মাসের বার তারিখে তিনশত চৌদ্দজন সাহাবীর এক বাহিনী নিয়ে তাদের তাড়া করার জন্য মদীনা হতে বের হলেন।
এদিকে কুরাইশ নেতা এখবর জানতে পেরে রাস্তা পরিবর্তন করে নদীর পার দিয়ে নিরাপদে দেশের দিকে রওনা হল। আর একজনকে এ সংবাদ দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করল যে, মককাবাসী যেন তাদের ব্যবসায়ী কাফেলাকে মুহাম্মদ (সঃ) হাত থেকে রক্ষা করে। মককায় মুশরিকগণ এ খবর শুনামাত্রই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। প্রতিশোধের লেলিহান শিখা তাদের হৃদয় কন্দরে জেগে উঠল। সহস্রাধিক অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী বদর প্রান্তে পৌঁছে গেল। ফলাফল বদর প্রান্তে পৌঁছে নবী করীম (সঃ) জানতে পারলেন কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলা চলে গেছে। আর বদরের অপর প্রান্তে এক বিরাট বাহিনী মুকাবেলার জন্য অপেক্ষা করছে। নবী করীম (সঃ) সাহাবায়ে কেরামের সাথে মশওয়ারাহ্ করে যুদ্ধের জন্য কাতার বন্দি করলেন। যুদ্ধ হল। আল্লাহ পাকের গায়েবী মদদে মুষ্টিমেয় সহায় সম্বল মুসলমানের বিজয় সূচিত হল। কাফেরদের সত্তর জন ধৃত হল। নিহত হল আর সত্তর জন্য। যার মধ্যে কট্টরপন্থী আবু জাহল ওত্ত্বা, শায়বা সহ বড় বড় নেতৃবন্দ ছিল।
তৃতীয় হিজরী:
এ হিজরীতে কাফেরদের বিরুদ্ধে মহানবী (সঃ) তিনটি জেহাদে অবতীর্ণ হন।
* গযওয়ায়ে গাতফান
* গযওয়ায়ে ওহুদ
* গযওয়ায়ে হামরাউল আসাদ এবং দুটি সারিয়া প্রেরণ করা হয়।
(১) সারিয়ায়ে যায়েদ বিন হারিস (রাঃ)
(২) সারিয়ায়ে মুহাম্মাদ বিন মুসলিমা (রাঃ) এ হিজরী সনের উল্লেখযোগ্য গযওয়া হল-গযওয়ায়ে ওহুদ।
চতুর্থ হিজরী:
এ হিজরীতে দুটি গযওয়া সংঘটিত হয়। (১) গযওয়ায়ে বনী নজীর। (২) গযওয়ায়ে বদরে সুগরা, এবং ৪টি সারিয়া প্রেরণ করা হয় (১) সারিয়ায়ে আবু সালমা (রাঃ)। (২) সারিয়ায়ে আব্দুল্লাহ বিন ওনাইস (রাঃ) (৩) সারিয়ায়ে মুনজির (রা) (৪) সারিয়ায়ে মুরহিদ (রাঃ)। এ হিজরীর উল্লেখযোগ্য গযওয়া হল গযওয়ায়ে বনী নজীর।
পঞ্চম হিজরী:
এ বৎসর ৪টি গযয়া সংঘটিত হয়। (১) গযওয়ায়ে জাতুর রেকা। (২) গযওয়ায়ে দাওমাতুল জন্দল। (৩) গযওয়ায়ে বনী মুসতালাক (৪) গযওয়ায়ে খন্দক। এর মধ্যে গযওয়ায়ে খন্দক উল্লেখযোগ্য।
ষষ্ঠ হিজরী:
এ বৎসর তিনটি গযওয়া সংঘটিত হয়-
(১) গযওয়ায়ে বনী লিহয়ান।
(২) গযওয়ায়ে গাবা।
(৩) গযওয়ায়ে হুদায়বিয়া এবং এগারটি সারিয়া প্রেরণ করা হয়।
(১) সারিয়ায়ে মুহাম্মদ বিন মুসলিমা (রাঃ) কারতা অভিমুখে।
(২) সারিয়ায়ে উককাশা (রাঃ)
(৩) সারিয়ায়ে মুহাম্মদ বিন মুসলিমা, জিল কিস্সা অভিমুখে
(৪) সারিয়ায়ে যায়দ বিন হারিসা (রাঃ) বনী সোলামান অভিমুখে।
(৫) সারিয়ায়ে আব্দুর রহমান আউফ (রাঃ)
(৬) সারিয়ায়ে আলী (রাঃ)
(৭)সারিয়ায়ে যায়িদ বিন হারিসা (রা) উম্মে কাষফা অভিমুখে।
(৮) সালিয়ায়ে আব্দুল্লাহ্ বিন রওয়াহা (রা)
(৯) সারিয়ায়ে আব্দুল্লাহ বিন আতীক (রাঃ)
(১০) সারিয়ায়ে কুরজ বিন জাবের (রাঃ)
(১১) সারিয়ায়ে আমরদ দমরী (রাঃ)।
এ বৎসরের উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ জিহাদ হল-হুদায়বিয়ার জিহাদ।
পাবলিশার অর্গানাইজেশন সিয়াম হাসান নিউস লিমিটেড