পরিবারিক জীবনে পর্দার ব্যবস্থা:
পারিবারিক জীবনকে পবিত্র এবং সুস্থ রাখিবার জন্য সর্বপ্রথম পালনীয় বিষয় হলে। লজ্জা-শরমকে মানুষের জীবনে জাগিয়ে তোলা।
স্বামী-স্ত্রী দুই জনের লজ্জা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ স্বামী-স্ত্রীর মিলিত জীবনধারার গতি অব্যাহত রাখিতে এই লজ্জা দ্বারা পবিত্র সুরক্ষিত রাখার জন্য তা একান্ত অপরিহার্য। স্বামীর যদি লজ্জা থাকে তা হলে তার নৈতিক চরিত্র ভাল থাকে। লজ্জা থাকা অবস্থায় কারো পক্ষে সম্ভব হবে না অবৈধ কোন কাজ করা। স্ত্রীরও যদি লজ্জা থাকে তবে পক্ষেও চরিত্রহীন হওয়া মোটেও সম্ভব নয়।
তার লজ্জা-শরম খুবই মহামূল্যবান বস্তু। এই বস্তু বর্তমান থাকিলে উভয়ের প্রতি উভয়ের তীব্র আকর্ষণ স্থায়ীভাবে বর্তমান থাকবে। স্বামী-স্ত্রীর প্রেম-মাধুর্যে কোন ফাটল দেখা দিবে না। একজন অপরজনকে সন্দেহের চোখে দেখবে না এবং বিরাগভাজনও হবে না। কাজেই লজ্জা-শরমের গুরুত্ব অপরিসীম। হযরত নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, নিশ্চিত সত্য হল, লজ্জা-শরম ঈমানের অঙ্গ। শরীয়তে লজ্জা-শরম এমন একটি বিশেষ গুণ, যা মানুষকে সকল প্রকার খারাপ ও মানবতাবিরোধী কাজ হতে, ফিরাইয়া রাখে। হযরত নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, লজ্জা-শরম বিপুল কল্যাণই নিয়ে আসে, তা থেকে কোন অকল্যাণের আশা নেই।
মানুষের জীবনের সব স্তরেই ও সব ব্যাপারেই ইহা অতি প্রয়োজনীয় গুণ। এই গুণের দ্বারাই মানুষে এবং পশুতে পার্থক্য করা যায়। এই গুণ না থাকলে মানুষে পশুতে কোন পার্থক্য করা যেত না। ফলে মানুষ পশুর স্তরে নেমে যেত। পশুর মত নির্লজ্জ হয়ে 'কাজ-কর্ম করত।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, লজ্জাই যদি তোমার না থাকল, তাহলে তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার।
অন্য একটি হাদীসে উল্লেখ আছে-লজ্জা-শরম নিতান্তই ঈমানের ব্যাপার। আর ঈমান হইল বেহেশতে যাবার চাবিকাঠি। পক্ষান্তরে লজ্জাহীনতা হচ্ছে জুলুম, আর জুলুমের কারণেই মানুষকে দোযখে যাইতে হইবে।
অতএব, এব, পারিবারিক জীবনে লজ্জা-শরম একটা গুরুত্বপূর্ণ গুণ। এ গুণ না থাকিলে অনেক খারাপ অভ্যাস প্রবেশ করে দাম্পত্য, জীবনকে যে কোন সময় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসিতে পারে। ফলে পরিবারের ধ্বংস হবার সম্ভাবনা থাকে। আর ধ্বংস প্রায় পরিবার ও সমাজের কোন কাজে আসে না।
সব ক্ষেত্রে চোখকে আয়ত্বে রাখা: স্বাভাবিক লজ্জা-শরমের অনিবার্য ফল হল চোখের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। চোখের দৃষ্টি এমন একটি যন্ত্র যার দ্বারা যেমন ভাল কাজও করা যায় আবার পাপের কাজও করা যায়। দৃষ্টি এমন একটি শাণিত তীর যা নারী-পুরুষের অন্তর ভেদ করে যায়। প্রেম-ভালবাসাতো এক অদৃশ্য জিনিস, যা কখনও চোখে ধরা পড়ে না। আসলে দৃষ্টি হচ্ছে। লালসাবহ্নির দক্ষিণ হাওয়া। মানুষের মনে দৃষ্টি যেমন লালসাগ্নি উৎক্ষিপ্ত করে, তেমনি তার ইন্ধন যোগায়। দৃষ্টি বিনিময় এক অলিখিত চিঠি আদান-প্রদানের মত যা-মনের পৃষ্ঠায় জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা হয়ে যায়।
সেই জন্যে সৃষ্টির এই ছিদ্র পথকেও বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। চোষের দৃষ্টিকে সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্যে দিয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশ। কোরআনে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ
مل للتامين بعض مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُونَ فُرُوجَهُمْ وَلكَ
أَرَكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
উচ্চারণ: কুললিল মু'মিনীনা ইয়াগন্দু দিন আবহারিহিম ওয়া ইযহফাজুনন ফুরুতাহন যালিকা অমকা লাহান। ইন্নাল্লাহা খারিরুম বিনা ইয়াহ নাউন।
অনুবাদ: মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রিত করে রাখে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে, এ নীতি তাদের জন্য অতিশয় পবিত্রতাময়। আর তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় অবহিত। সূরা নূর আয়াত ৩০। শুধু পুরুষদেরকেই নয়, মুসলিম মহিলাদের সম্পর্কেও বলা হয়েছে,
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ بَعْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُونَهُنَّ
উচ্চারণ: ওয়া কুললিল মু'মিনীনাতি ইয়াগসুদনা মিন আবছারি বিন্না ওয়া ইয়াহ ফাজনা ফুরুজাহনা।
অনুবাদ: মু'মিন মহিলাদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদেরলজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে। সূরা নূর আয়াত ৩১।
উপরের দুটি আয়াতে একই কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে চোখের দৃষ্টিকে। নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং নিজের লজ্জাস্থানকে হেফাযত করার কথা। এ আয়াতের দ্বারা বোঝা যায় দৃষ্টি নিম্নেণ পুরুষ এবং স্ত্রী উভয়ের জন্য সমানভাবে জরুরি। এ আয়াত দুটির দ্বারা আল্লাহ পাক বলেছেন আল্লাহর হুকুম পালন করতে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকতে। কাজেই আল্লাহ পাকের আইন অনুসারে যার প্রতি চোখ তুলে তাকানো নিষিদ্ধ, তার প্রতি যেন কেহ তাকাতে সাহস না করে। আর দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের অনিবার্য ফল হল অন্তরের পরিত্রতা রক্ষা। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ এবং লজ্জাস্থানের হেফাযত করা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ হলে অবশ্যই লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা পাবে। কিন্তু যদি দৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত না হয় তাহলে পর পুরুষ কিংবা পর স্ত্রী দর্শনের ফলে হৃদয়-মনের গভীর প্রশান্তি বিঘ্নিত ও চূর্ণ হবে, অন্তরে লালসার উত্তাল উন্মাদনার সৃষ্টি হয়ে লজ্জাস্থানের পবিত্রতাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে। যেখানে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত নয়, দেখাশোনার ব্যাপারে কোন বাছবিচার নাই সেখানে লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। কাজেই ইসলাম মানুষকে প্রথমে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছে। দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রিত রাখলে চরিত্র ভাল রাখা সম্ভব হয়। মু'মিন হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রী-পুরুষ যদি আল্লাহ পাকের দেওয়া এ হুকুম পালন না করে তাহলে নিশ্চয়ই সে শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ পাক তাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে পুরামাত্রায় অবহিত রয়েছেন।
ইমাম তাইমিয়া বলেছেন, চোখ নিয়ন্ত্রণ ও নিচু করে রাখায় চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি পায়। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের জন্য স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়কে আলাদা আলাদাভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যৌন উত্তেজনার ব্যাপারে স্ত্রী ও পুরুষের একই অবস্থার সৃষ্টি হয় বরং স্ত্রীলোকের দৃষ্টি পুরুষদের মনে বিরাট আলোড়ণের সৃষ্টি করে থাকে। প্রেমের আবেগ ও উচ্ছ্বাসের ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকের প্রতিকৃতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থার। কারো সাথে চোখ বিনিময় হলে স্ত্রীলোক সর্বপ্রথম কাতর ও কাবু হয়ে পড়ে, যদিও তাদের মুখ ফুটে না। এ কারণেই স্ত্রীলোকদের চোখের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা বিশেষ প্রয়োজন। এমন ঘটনা ঘটা তেমন কোন অস্বাভাবকি কিছু নয় যে, কোন সুশ্রী স্বাস্থ্যবান যুবকের প্রতি কোন মেয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হল, আর অমনি তার সমস্ত দেহে, গ্রেমের বিদুত্তরঙ্গ খেলে গেল। সৃষ্টি হল প্রলয়ঙ্কর ঝড়। ফলে তার রহিরাঙ্গ কলংক মুক্ত থাকলেও তার অন্তর নোংড়া হয়ে গেল। স্বামীর হৃদয় হতে তার মন পাকা ফলের মতো একেবারে ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তার প্রতি তার মন হল বিমুখ। পরিণামে দাম্পত্য জীবনে ফাটল দেখা দিল আর পারিবারিক জীবন হল ছিন্নভিন্ন।
চোখের দৃষ্টিচালনা ব্যাপারে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নির্দেশ:
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলিয়াছেন, তোমাদের দৃষ্টিকে নিচু কর, নিয়ন্ত্রিত কর, এবং তোমাদের লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ কর। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, হে আলী। একবার কোন পরস্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি পড়লে পুনরায় তার প্রতি চোখ তুলে তাকাবে না। কেননা তোমার জন্য প্রথম দৃষ্টিই ক্ষমারযোগ্য, দ্বিতীয়বার দেখা চলবে না। হঠাৎ করে কারও প্রতি চোখ পড়ে যাওয়া আর ইচ্ছাকৃতভাবে কারও প্রতি তাকানো সমান কথা নয়। প্রথমবারে যে চোখ কারো উপর পড়ে যায়, তার মূলে ব্যক্তির ইচ্ছার বিশেষ কোন যোগ থাকে না; কিন্তু দ্বিতীয় বার তাকে দেখা ইচ্ছাক্রমেই হওয়া সম্ভব। এই জন্যে প্রথম বারের দৃষ্টি ক্ষমারযোগ্য এতে কোন দোষ হবে না; কিন্তু দ্বিতীয়বারের দৃষ্টির পিছনে মনের কুলষতা, লালসা, পংকিল উত্তেজনা থাকাই স্বাভাবিক। আর এ ধরনের দৃষ্টি দিয়ে পরস্ত্রীকে দেখা হারাম।
পর্দার প্রাথমিক ব্যবস্থা:
ইসলামের আইনে নারীর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হল তার ঘর। ঘরকেই আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করা এবং স্থায়ীভাবে ঘরের ভিতর অবস্থান করাই হলো মুসলিম নারীর কর্তব্য। এ ব্যাপারে কোরআনে আল্লাহ তা'আলা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।
وَقَرْنَ فِي بُيُتِكُنَّ وَلَا تُبَرِّجُنُ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى
উচ্চারণ: ওয়া ক্বারনা ফী বুযুতিকুন্না ওয়ালা তাবাররুযনা তাবাররুজাল জাহিলিয়্যাতিল উলা।
অনুবাদঃ এবং তোমরা তোমাদের ঘরের অভ্যন্তরে স্থায়ীভাবে বসবাস কর এবং পূর্বকালীন জাহিলিয়াতের মতো নিজেদের রূপ-সৌন্দর্য ও যৌনদীপ্ত দেহাঙ্গ দেখিয়ে বেড়িও না।
উল্লিখিত আয়াতটির প্রথম দিকে বলা হয়েছে নারীর আসল স্থান হল ঘর। অতএব, ঘরে অবস্থান করাই নারীদের কর্তব্য। সকল নারীর জন্যই একখানা ঘরের দরকার। এমন একখানা ঘরের দরকার যেখানে নারীর বসবাসের স্থান নির্দিষ্ট ও সর্বজন পরিচিত। দ্বিতীয়, তার এই ঘর হইবে তার অবস্থানের জায়গা ও কর্মকেন্দ্র। নারী জীবনের যা কিছু করণীয় তা প্রধানত এই ঘরকে কেন্দ্র করিয়াই করিতে হইবে। কিছু কিছু মহিলা হযরত মুহাম্মদ - (সাঃ)-এর খেদমতে হাযির হয়ে আরজ করিলেন, হে মহান আল্লাহর রাসূল। পুরুষগণতো আল্লাহর প্রদত্ত বিশিষ্টতা ও আল্লাহর পথে জিহাদ প্রভৃতির মাধ্যমে আমাদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। আমরা কোন কাজ করতে পারি, যা করে আমরা আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের মর্যাদা লাভ করিব? এই প্রশ্নের জবাবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বললেন, যে মেয়েলোক তাহার নিজের ঘরে অবস্থান করিল, সে ঠিক আল্লাহর পথে জিহাদকারীর কাজ সম্পন্ন করিতে পারিল। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরও বলিয়াছেন, মেয়েদের ঘরের কোণই হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম মসজিদ।
উম্মে হুমাইদ নামক এক মহিলা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করিল, হে আল্লাহর রাসূল। আমি আপনার সঙ্গে জামাআতে মসজিদে নামায পড়িতে ভালবাসি।
তখন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলিলেন, হ্যাঁ, আমি জানিতে পারিলাম তুমি আমার সঙ্গে জামাআতে নামায পড়া খুব পছন্দ কর। কিন্তু স্মরণ রেখ, তোমার শয়নকক্ষে বসে নামায পড়া তোমার জন্য বৈঠকখানায় নামায পড়া অপেক্ষা ভাল। বৈঠকখানায় নামায পড়া ঘরের আঙ্গিনায় নামায পড়া অপেক্ষা ভাল, ঘরের আঙ্গিনায় নামায পড়া ঘরের কাছাকাছি মহল্লার মসজিদে নামায পড়া অপেক্ষা ভাল। আর তোমার মহল্লার মসজিদে নামায পড়া আমার এই মসজিদে নামায পড়া অপেক্ষা ভাল। তারপর সেই মেয়েলোকটির আদেশে তার ঘরের দূরতম ও অন্ধকারতম কোণে নামায়ের জায়গা বানিয়ে দেওয়া হল এবং সে মৃত্যু পর্যন্ত এখানেই নামায পড়েছিল।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলার কাছে মেয়েলোকের সেই নামায সবচেয়ে বেশি প্রিয় ও পছন্দনীয়, যা সে তার ঘরের অন্ধকারতম কোণে পড়িয়াছে।
হযরত উম্মে আতীয়াতা (রাঃ) বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আমাদেরকে জানাযায় বের হতে নিষেধ করেছেন।