বিবাহের অলিমা বা খানা-পিনা:
অলিমা শব্দের অর্থ হল বৈবাহিক ভোজ। আর শরীয়তের পরিভাষায় স্ত্রীকে স্বামীর বাড়িতে প্রথমবার এনে স্বামীর পক্ষ হতে স্ত্রীর পক্ষের লোকদেরকে খানার দাওয়াত দেওয়া। অলিমা করা সুন্নত। হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর বিবাহের পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছিলেন, অলিমা কর, যদিও একটি বকরী দ্বারা হউক না কেন। যাহার বকরী জবেহ করার সামর্থ নাই সে যাহা কিছু খাওয়ার বস্তু আছে, তাহাই আত্মীয়-স্বজনের খেদমতে হাজির করবে তাহাতে অলিমা হয়ে যাবে।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হযরত জয়নাব (রাঃ)-এর বিবাহে একটি বকরী দ্বারা অলিমা করেছিলেন এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের গোশত-রুটি খেতে দিয়েছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হযরত সুফিয়া (রাঃ)-কে বিবাহ করার পর খোরমা ও জবের ছাতু দিয়ে পনির এবং
মাখানের দ্বারা তৈরি মিষ্টি দিয়ে অলিমা করেছিলেন।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কোন এক স্ত্রীর বিয়ের অলিমার খাদ্যসামগ্রী ছিল ১৩৫ তোলাগেই। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের কাউকে যদি অলীমার দাওয়াত দেওয়া হয় তবে তাহা কবুল করিও।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ঐ অলিমার খাদ্য সবচেয়ে খারাপ যাহাতে শুধু ধনী লোকদের দাওয়াত করা হয় এবং গরীবদিগকে দাওয়াত করা হয় না। আর যে ব্যক্তি দাওয়াত ছেড়ে দিল সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করল।
বিবাহের প্রথম দিনের খাদ্য হক, দ্বিতীয় দিনের খাদ্য সুন্নত এবং তৃতীয় দিনের খাদ্য লোককে শুনানো, আর যে লোককে শুনায় আল্লাহ পাকও তাহা শুনাইয়া দেন। বিবাহের খাদ্য বেহেশতি খোশবু মেছকাল পরিমাণ আছে।হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর বিবাহে উম্মে আয়মনকে তাঁহার সঙ্গে তাঁহার সমূদয় কাজ-কর্মে সাহায্য করার জন্য পাঠাইয়াছিলেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর বিয়েতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একটি দুম্বা দ্বারা অলিমার কাজ সম্পন্ন করেন। দুম্বাটি বনী সাদের দেওয়া হয়েছিল। বিয়েতে সবাইকে দাওয়াত করেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, কাউকে যদি অলিমার দাওয়াত করা হয়ত তবে দাওয়াত কবুল কর এবং যাও। আর যদি রোযা থাক তবে ঐ বাড়িতে যেয়ে তাহাদের জন্য দোয়া কর এবং ইহা বলিও না যে আমি যাইব না। অলিমার দাওয়াত খাইতে যাইয়া নিচের দোয়াটি পড়তে হয়।
بَارَكَ اللَّهُ لَكَ بَارَكَ اللَّهُ عَلَيْكَ وَجَمِعَ بَيْنَهُمَا فِي خَيْرٍ
অলিমার দাওয়াতে বিবাহের সংবাদ প্রকাশিত হয়ে থাকে। অলিমার দাওয়াত সুন্নত,উহাতে অনেক পুণ্য নিহিত রয়েছে। অলিমার দাওয়াত প্রথম দিন দ্বিতীয় দিন তৃতীয় দিন জায়েয আছে তারপর অলমা ও বিবাহের দাওয়াত থাকে না।
বিধবা বিবাহ প্রথা:
কোন স্ত্রীলোকের স্বামীর মৃত্যু হলে ঐ স্ত্রীলোককে বিধবা বলে। কোন পুরুষের স্ত্রীর মৃত্যু হলেই যেমন তাকে আবার বিয়ে করতে হয়, তেমনি কোন স্ত্রীলোকের স্বামীর মৃত্যু হলে বা আগের স্বামী তালাক দিলে তাহাকে পুনরায় বিয়ে করতে হয়। কারণ পুরুষের যেমন যৌন উত্তেজনা আছে মেয়েদের তার চেয়ে বেশি যৌন উত্তেজনা শক্তি আছে।
কোন পুরুষ তার যৌন উত্তেজনা প্রশমিত করতে না পারলে যেমন অস্থির হয়ে উঠে নারীও তেমনি তার যৌন বাসনা পূরণ করতে না পারলে অস্থির হয়ে যায়। এই সাধারণ জান যাদের নাই তারাই কন্যা যা বোন বিধবা হলে তাহাদিগকে পুনরায় বিয়ে দিতে গড়িমসি করতে থাকে।
আমাদের সমাজে কিছু অজান লোক আছে, ধর্ম বিবর্জিত লোক আছে, যারা নিজেদের স্ত্রী বিয়োগজনিত ঘটনার পরই বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠে। অথচ নিজের নিজের কন্যা বা বোন বিধবা হলে তাহাদের পুনরায় বিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করে না। এমন কি কেহ কেহ ইহাকে অপমানজনক মনে করে থাকে। ইহাতে তাহারা ইসলামের বিধান অমান্য করে বলে পাপের ভাগী হয়।
বিধবা নারীগণ যদি যৌন উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে যায় তবে তাদের সে পাপের গুনাহের জন্য শুধু বিধবার দায়ী থাকবে না। বরং তার অভিবাবকগণ, যারা দীর্ঘকাল বিধবা কন্যা বা বোনকে বিবাহ না দিয়ে কর্তব্য অবহেলার আশ্রয় নিয়েছিল তাদের কঠিন শাস্তি হবে। এছাড়া গোপনে গোপনে ব্যভিচার করার ফলে যখন তারা গর্ভবর্তী হয়ে যায়, তখন সারা গ্রামে দুর্নাম ছড়াইয়া পড়ে, তখন সেই সব সম্মানিত লোকদের সম্মান কোথায় থাকে?
নারী পুরুষের প্রত্যেককেই আল্লাহ পাক যৌন উত্তেজনা নামক একটি জিনিস দিয়েছেন। এটা শুধু মানুষের জন্যই নয়, প্রাণিকুলের মধ্যে এই কামনা-বাসনা রয়েছে। যাহার ফলে অন্যান্য প্রাণীগণও স্ত্রী পুরুষে মিলিত হতে বাধ্য হয়। এই কামনা-বাসনার ফলেই নারী পুরুষ একত্রে মিলিত হয় এবং তাহারই ফলে তাহাদের বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে। এতে আল্লাহ পাকের সৃষ্টি রক্ষা হয়। এই জৈবিক চাহিদা প্রত্যেকটি নারী-পুরুষের মধ্যে প্রায় সমানভাবে বিরাজমান। ইহা আল্লাহ পাকের সৃষ্টি রক্ষার একটি কৌশল। কাজেই এই কামনা-বাসনাকে কেহই দমন করে রাখতে পারে না। যদি জোরপূর্বক ইহাকে দমন করতে চায় তবে মানুষ হয়ত তাহা সহ্য করতে পারবে না, পাগল হয়ে যাবে। যার ফলশ্রুতিতে লোকলজ্জার ভয় উপেক্ষা করে এ ঘটনা ঘটাইয়া থাকে। কাজেই কাহারও কন্যা বা বোন বিধবা হলে খুব তাড়াতাড়ি তাকে বিয়ে দিতে হয়।
হযরত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর নিজের জীবনে যে কয়জন স্ত্রীকে বিবাহ করেছিলেন তার মধ্যে কেবলমাত্র হযরত আয়েশা (রাঃ) ছাড়া বাদবাকী সবাই বিধবা অথবা স্বামী পরিত্যাক্তা ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নিজের কন্যা রোকাইয়া ও উম্মে কুলসুম (রাঃ)-কে দ্বিতীয় বার বিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ পাক কোরআনে বলেছেন, তোমাদের মধ্যে বিধবাকে বিবাহ দাও।
বহু বিবাহের কুফল:
আমাদের সমাজে অনেক আছে যারা একাধিক বিয়ে করে। তারা ধারণা করে ইসলামি শরীয়তে যেহেতু চারটি বিয়ে করার হুকুম আছে কাজেই একাধিক বিয়েতে দোষ কি। কোন লোক এককালে একাধিক বিবাহ করলে প্রত্যেক স্ত্রীর প্রতি তার সমান ব্যবহার করতে হবে এবং প্রত্যেকের জন্য আলাদা বাসগৃহের ব্যবস্থা করতে হবে। খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, সহবাস প্রভৃত বিষয়ে প্রত্যেক স্ত্রীকেই সমান অধিকার দিতে হবে। যদি কেহ এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা সব স্ত্রীকেই দিতে পারে তবে একাধিক বিয়ে করতে পারে। যদি প্রত্যেক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষা করতে না পারে তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাকের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার অপরাধে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
একাধিক বিবাহের এই নিয়ম পালন করা খুবই কঠিন, কোন পুরুষের পক্ষেই এটা সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহ পাকের শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য একাধিক বিয়ে হতে দূরে থাকা উচিত। যদি একান্ত সম্ভব না হয় তবে বিয়ে করতে পারে।
কোন পুরুষের স্ত্রী যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তার দ্বারা যদি সংসারের কোন কাজকর্ম করাতে না পারে, যদি তার সাথে যৌন ক্রিয়া করা সম্ভব না হয়, তবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে বিয়ে কর। যেতে পারে। সতী এবং স্বামীভক্ত-স্ত্রীগণ সাধারণত স্বামীর অসুবিধা ও সংসারের বিশৃংখলা দূরিকরণার্থে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিয়ে থাকে । অনেক জায়গায় দেখা যায় দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য স্ত্রী স্বামীকে অনুরোধ করে থাকে।
কোন স্ত্রীর গর্তে যদি সন্তান না আসে এবং ভবিষ্যতে সন্তান আসার কোন সম্ভবানা না থাকে, তবে সন্তান লাভের আশায় দ্বিতীয় বিবাহ করে। এমন অসুবিধার ক্ষেত্র বিয়ের প্রয়োজন আছে। এমন অবস্থায় কোন কোন স্ত্রী স্বামীর মনের কষ্ট অনুভব করে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিয়ে থাকে। কেহ যদি স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করে তবে সেই সংসারে সতীনের অবস্থান প্রথম স্ত্রী মেনে নিতে চায় না। ফলে সংসারে অশান্তি দেখা দেয়। ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে। আর যে সংসারে সব সময় ঝগড়া-বিবাদ থাকে সে সংসারে কোন উন্নতি হয় না।
বর্তমান সমাজে কিছু লোক শুধুমাত্র নিজের জৈবিক প্রয়োজনে, যৌন উত্তেজনা প্রশমনের জন্য, নেহায়েত খেয়ালের বসে দুটি তিনটি এমন কি চারটি পর্যন্ত বিয়ে করার প্রবণতা দেখা যায়। তাহারা এই বিবাহ করার আগে একটুও চিন্তা করে না যে, সে নিজের শান্তির সংসারে একটা ভীষণ অশান্তির সৃষ্টি করতে যাইতেছে। পরে অবশ্যই ইহার বিষময় ফল সে ভোগ করতে থাকে। তখন তার আফসোস আর অনুতাপের সীমা থাকে না। একাধিক বিয়ে করার অর্থই সংসারে হিংসা, বিদ্বেষ, ঝগড়া, কলহ ইচ্ছা করে আমদানি করা। কোন স্ত্রীই চায় না তার স্বামীর মধ্যে অন্য কোন স্ত্রীলোক এসে ভাগ বসায়। পৃথিবীতে এমন কোন সংসার নাই যেখানে একাধিক স্ত্রী আছে অথচ সংসারে কোন অশান্তি নেই। স্ত্রী যেমন তার স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে চায় না। স্বামীর বুঝতে হবে স্ত্রীর মনের অনুভূতি। এটা চিন্তা করতে হবে যে, তার স্ত্রী যদি অন্য পুরুষের সংগে মেলামেশা করতে চায়, তবে তার মনের প্রতিক্রিয়া কি হবে। তখন তো সে তার স্ত্রীকে মারধোর বা এর চেয়েও জুলুম কিছু তার উপরে প্রয়োগ করবে। কাজেই পুরুষের চিন্তা-ভাবনা করে দ্বিতীয় বিয়ের দিকে মন দিতে হবে।
সুখ-শান্তি লাভের জন্য যারা একাধিক বিয়ে করে। সুখ-শান্তিতো তাদের ভাগ্যে জুটে না বরং অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। যেটুকু শান্তি সংসারে ছিল তাও চিরতরে মুছে যায়। আবার প্রত্যেক স্ত্রীর সাথে সমানভাবে তাদের অধিকার প্রয়োগ না করার ফলে আখেরাত বরবাদ হয়ে যায়। তাহলে দেখা যায় দ্বিতীয় বিয়ের ফলে তার দুনিয়ার শান্তি এবং আখেরাতের শান্তি নষ্ট হয়ে যায়।
এ ব্যাপারে আমার জানা একটি ঘটনার অবতারণা করছি । একজন লোকের দুইজন স্ত্রী ছিল। তাদের কেহই স্বামীর খেদমত করত না। প্রথম স্ত্রী মনে করত দ্বিতীয় জনতো আছেই। আমি তার খেদমত করতে পারি না দেখেই তো দ্বিতীয় জন এনেছে। কাজেই দ্বিতীয় জন তার খেদমত করবে। আবার দ্বিতীয় জন মনে করে আমি সংসারে এসেছি নতুন আমি এত কিছু করতে পারব না। বড়জন আছে সেই এসব করবে। একদিন উঠানে অনেকগুলো সরিষা রোদ্রে শুকাতে দেয়। এমন সময় আকাশে মেঘ জমে এবং বৃষ্টি নেমে পড়ে। দুইজন স্ত্রী দুই ঘরে বসে রয়েছে। তারা একে অপরের কথা ভাবছে যে, বড়জন বলছে ছোটজন তো আছে আর ছোটজন বলছে বড়জন তো আছে। এইভাবে তাদের উঠানে ছড়ানো সরিষা বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেল। এই হল একাধিক বিয়ের মুটামুটি চিত্র।
যে ব্যক্তি পূর্ণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ও ধন-সম্পদে যথেষ্ট শক্তি সম্পন্ন, একাধিক স্ত্রী ভরণ-পোষণের যথেষ্ট আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং প্রত্যেক স্ত্রীকে যৌন আনন্দ দেওয়ার মত সামর্থ আছে। শুধু সেই ব্যক্তিই প্রয়োজনবোধে একাধিক বিবাহ করতে পারে। কিন্তু তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে একাধিক বিবাহ করার প্রধান শর্ত হল যে, সব স্ত্রীর প্রতি সমান ব্যবহার করতে হবে।
একের অধিক বিয়ে করে কয়েকজন স্ত্রীলোকের সমাবেশ ঘটাইয়া সংসারে বিবাদ-বিসম্বাদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও অশান্তির সৃষ্টি না করে একজন স্ত্রীতেই সন্তুষ্ট থেকে পূর্ণ প্রেম, পূর্ণ শান্তিময় সংসারের আনন্দ উপাভোগ করাই উচিত।
আসসালামু আলাইকুম আশা করি আপনার সকলে ভালো আছেন আপনাদের সঙ্গে আমি আছি হৃদয়ে কনটেন্ট রাইটার ফর সিয়াম হাসান নিউস লিমিটেড আপনি যদি আমাদের আমাদের এই আর্টিকেলটি আপনার ভালো লাগে পরবর্তী থেকেও আপনি আসতে পারেন